সাতকানিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা প্রণব ধরকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত না করায় ফুসে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি

শেয়ার করুন

Read Time9 Minute, 53 Second

সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া থেকে
সাতকানিয়ার চরতি ইউনিয়নের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা প্রণব কুমার ধর [প্রকাশ পি কে ধর রুনু] রণাঙ্গণের একজন লড়াকু সৈনিক হিসেবে পরিচিত ছিল সাতকানিয়াসহ চট্টগ্রামের সর্বত্র। তিনি অসুস্থতা জনিত কারণে নিজ বাড়িতে পরলোক গমন করেন। তবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একজন মুক্তিযোদ্ধা মারা গেলে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন বা সমাহিত করার কথা। কিন্তু তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাতো দূরের কথা উল্টো রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেয়ার জন্য অভিযোগ দেওয়ায় রুনু ধরের স্বজনদের পাশাপাশি ক্ষোভে ফুঁসছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি। এ নিয়ে লেখালেখির মাধ্যমে তোলপাড় চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অপর দিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির এর রকম অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ভাবে ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানিয়েছেন সচেতন ব্যক্তিরা। অন্যদিকে গতকাল [বুধবার] বিকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ দক্ষিণ চট্টগ্রামের ব্যানারে মানব বন্ধন করে এর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি ও স্বজনদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, গত রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিজ বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার চরতি ইউনিয়নের তুলাতলি এলাকার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রণব কুমার ধর [প্রকাশ পি কে ধর রুনু] পরলোক গমন করেন। এ বীরের মৃত্যুর খবরটি সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ও বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রুনু ধরের মৃত্যুর পরদিন সোমবার [১৩ জানুয়ারী] সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবু তাহের এলএমজি নিজেকে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে দাবী করে তার স্বাক্ষরিত ও ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার স্বাক্ষর ও গেজেট নং উল্লেখ করে রুনু ধরকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্মানে’ সমাহিত না করার জন্য সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রশাসকের [ যেহেতু কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ তাই ইউএনও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক] নিকট আবেদন করেন। ইউএনও আবু তাহের এলএমজিদের দেয়া আবেদনের সত্যতা যাচাই না করে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা থেকে বিরত থাকেন। বিষয়টি বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হতে থাকলে সাতকানিয়াসহ পুরো চট্টগ্রামে শুরু হয় তোলপাড়। আবু তাহের স্বাক্ষরিত অভিযোগে বিষয়ের মধ্যে লেখা রয়েছে-রুনু ধর, প্রণব কুমার ধর নয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধাও নন। তাই তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত না করার আবেদন। দরখাস্তের বিষয়বস্তুতে উল্লেখ রয়েছে- ২২/১১/২০১৫ ইং প্রকাশিত গেজেটে তার নাম ৩০১২ নামীয় তালিকাভুক্ত হয়। গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে তাকে খুজিয়া পায় নাই। এ ছাড়া তার নামে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রাণালয়ে কোন সাময়িক সনদপত্র পাওয়া যায়নি। ঐ ব্যক্তিকে সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কোন ভাবেই চিনেন না। অথচ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বেসামরিক গেজেটে দেখা যায়-প্রণব কুমার ধর, পিতা- মৃত পরিমল কুমার ধর, গ্রাম- তুলাতলি, ইউনিয়ন- চরতি, উপজেলা- সাতকানিয়া, জেলা- চট্টগ্রাম উল্লেখ রয়েছে। গেজেট নং- ৩০১২ লেখা রয়েছে। এছাড়া উপজেলায় বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠানে তাকে সামনে কাতারে বসা এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মাননা নেয়ার ছবিও দেখা গেছে। অন্যদিকে, গতকাল চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে রুনু ধরকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না দেয়ায় মানব বন্ধনের আয়োজনের বিষয়ে দক্ষিণ জেলা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হাসান বলেন, রুনু দা খুবই সাদা সিধে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল। তার লোভ বলতে কিছুই ছিল না। তাকে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ায় আমরা চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানব বন্ধন করেছি। জড়িতদের বিরুদ্ধে আগামীতে আরও কর্মসূচি আমরা দিব।
এ ব্যাপারে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রুনু দাকে আমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই জানি। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অনুষ্টানে প্রথম সারিতে তাকে আমরা দেখেছি। যাদের অবহেলায় তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেয়ার বিষয়টি মর্মাহত হওয়ার পাশাপাশি আমাদের জন্য অপমান জনকও বটে।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, শুধু মুক্তিযুদ্ধে নয়। জামায়াত-শিবির ও স্বাধীনতা বিরোধীদের তান্ডব মোকাবেলা ও রাজনৈতিক যে কোন সংকটে রুনু দা নেতৃত্ব দিয়েছেন, সামনে থেকে। আর রুনু দাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত না করার জন্য যারা অভিযোগ দিয়েছেন বলে শুনেছি, তাদের কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে অনেক আগেই। এদিকে দরখাস্তে দেয়া তাদের স্বাক্ষরের সত্যতা তদন্ত করা উচিত ছিল ইউএনও সাহেবের। যেহেতেু তিনি এখন এ কমিটির প্রশাসক। এখন প্রশ্ন-কেন তিনি [ইউএনও] যাচাই না করে দরখাস্তের উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া থেকে বিরত ছিল? এটি কতটুকু সংগত এবং তিনি দায়িত্ব এড়াতে পারেন কিনা? তা যাচাইয়ের দাবী রাখে।
রুনু ধরের আপন ছোট ভাই সুশান্ত ধর অভিযোগ করে বলেন, আমার ভাই ব্যক্তি জীবনে খুবই সৎ ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছে কোন কিছু পাওয়ার লোভে নয়। অন্ততঃ মৃত্যুর পর তাকেও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া উচিত ছিল। সম্মাননা দেয় নাই। তাতে কোন দুঃখ নাই। কিন্তু মৃত্যুর পর তাকে বিতর্কিত করাই আমাদের শোককে আরও দ্বিগুন করে দিয়েছে।
এ ব্যাপারে সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবু তাহের এলএমজির ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেনি।
এ ব্যাপারে সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, রুনু ধর আসলে প্রণব কুমার ধর নয় এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধও নন- মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের এলএমজিসহ ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার স্বাক্ষরিত এমন একটি লিখিত অভিযোগ আমি পেয়েছি। এছাড়া মৃত মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের পক্ষ থেকেও আমাকে কেউ জানায়নি। তাই তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া থেকে বিরত ছিলাম।

0 0
Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleppy
Sleppy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close