জুন ১৯, ২০২১ ৭:১২ অপরাহ্ণ

দুর্দান্ত কল্পনা, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা

শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সকল খাতে উন্নয়ন আর পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। বিশেষ করে সুদূর প্রসারী ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। দেশের পরিকল্পনীয় আর্থ-সামাজিক বিবর্তন বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন দ্বীপ কল্পনায়।
ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সামষ্টিক পরিকল্পনা যা দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত বিবর্তনাধীন সমস্যাগুলো বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নকে সহায়তা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার আলোকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতি আদর্শ অনুসরণে এই পরিকল্পনা নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায় প্রণীত হয়েছে। আগামী ১০০ বছরে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাকে হিসেবে ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় দেশকে (১) উপকূলীয় (২) বরেন্দ্র ও খড়াপ্রবণ ভূমি (৩) হাওড় ও আকস্মিক বন্যাপ্রণ এলাকা (৪) পার্বত্য চট্টগ্রাম (৫) নদী অঞ্চল ও মোহনা এবং (৬) নগর এলাকাসমূহে এ বিভাজিত করে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জসমূহ বিবেচনা করে দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নকে যথাযথ সহায়তার জন্য প্রণীত হয়েছে। এই পরিকল্পনায় ৩টি জাতীয় লক্ষ্য এবং ব-দ্বীপ সংশ্লিষ্ট ৬টি অভীষ্ট নির্ধারিত হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারিত ৩ লক্ষ্য (১) ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ (২) একই সময়ে মধ্যম আয়ের দেশের সক্ষমতা অর্জন এবং (৩) ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ দেশে উত্তরণকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আয়তন মাত্র ১ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার, কিন্তু জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এই দেশে এখন প্রতি বর্গকিলোমিটার জায়গায় বসবাস করছে এক হাজার দুইশত আটান্ন জন মানুষ। ম্যাকাও, মোনাকো, সিঙ্গাপুর, হংকং এই রকম কয়েকটি ক্ষুদ্রদ্বীপ ও নগররাষ্ট্রের কথা বাদ দিলে বাংলাদেশের জনঘনত্ব এখন পৃথিবীর সবচাইতে বেশি। বাংলাদেশের সর্বত্রই মানুষ বেশি, আর সকল কিছুই কম। চাষাবাদের জায়গা কম, বসবাসের জায়গা কম, রাস্তাঘাটের জায়গা কম, কলকারখানা স্থাপনের জায়গা কম, হাসপাতালে রোগীদের জন্য জায়গা কম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য জায়গা কম, শিশুদের খেলাধুলার জায়গা কম। জায়গা কম বলেই জায়গাজমি নিয়ে মারামারি-খুনাখুনি বেশি। জায়গা কম বলেই ভরাট হচ্ছে নদ-নদী, খাল-বিল, দিঘি-পুকুর।
জায়গাজমি কম হলেও দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা অন্যসব দেশের তুলনায় বেশি। বর্তমানে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কোনো দেশে যদি ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কর্মক্ষম থাকে, তাহলে সে দেশকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মধ্যে ধরা হয়। বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্তি¡ক বোনাসকালের সুবিধা ভোগ করছে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি যখন শ্রমশক্তিতে পরিণত হয়, তখন সেটি নিশ্চয়ই বোঝা হতে পারে না। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন কর্মক্ষম জনসংখ্যার অভাবে ভুগছে, তখন বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ সুযোগ গ্রহণ করে এরই মধ্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী দেশ চীন। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন অনেকদিন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে পিছিয়ে ছিল। আশির দশক থেকে তাঁদের তরুণদের সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সৃষ্টি করে। চীন তার বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করেছে। বর্তমানে তাঁরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে চীন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও অতিক্রম কর যাবে বলে অর্থনীতিবিদরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন তরুণ জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র। এ অঞ্চলের ৪৫টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতির নিযুত সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছেÑ এ দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। ২০৩০ সালে দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১৩ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত হবে। ইউএনডিপির মতে, এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে অফুরন্ত সম্ভাবনার বড় সুযোগ এনে দিয়েছে।
দূরদর্শী বর্তমান সরকার এইখাতের সুযোগ কাজে লাগিয়েই ২০৪১ সালের মধ্যে ‘উন্নত রাষ্ট্র’ কল্পনার ভেলা ভাসিয়েছেন। এই ভেলার মাঝিমাল্লার হলো দক্ষ-প্রশিক্ষিত তরুণ যুবগোষ্ঠী। অথচ সেই সম্ভাবনাময় তরুণদের বিশ্ব শ্রমবাজারে টিকে থাকার মতো সম্পদে পরিণত করা যায়নি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বেকারত্ব ঘোচাতে অক্ষম। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলও’র তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। বেকারত্বের এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে দু-এক বছরের মধ্যে মোট বেকারের সংখ্যা ছয় কোটিতে পৌঁছবে। ফল হবে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতির পারদ হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। এ খাতে ৪০ লাখেরও বেশি নারী পোশাককর্মী কাজ করছে। তাদের আয় ১৭ বিলিয়ন ডলার। তৈরি পোশাক খাতে ম্যানেজারিয়াল ও টেকনিক্যাল বিভাগে ২ লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করছেন। তাদের আয় ৭ বিলিয়ন ডলার। অথচ দেশের ৮৫ লাখের বেশি শ্রমিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করে রেমিটেন্স পাঠায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের মতো। সেখানে ২ লাখ বিদেশি আমাদের দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে ৭ বিলিয়ন ডলার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি-বেসরকারি, শিল্পগোষ্ঠী নিজেরা পরিকল্পিতভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কাজে হাত দিতে হবে।
নি¤œ-মধ্য আয়ের দেশ থেকে ২০২৩ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে ধাবমান বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮ শতাংশ অতিক্রম করা। সেটা অতিক্রম করতে হলে ইউএনডিপি উল্লিখিত ৬৬ শতাংশ কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। অদক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তরিত করতে হবে দক্ষ জনশক্তিতে। জোর দিতে হবে নারী শিক্ষা সম্প্রসারণের ওপর। বাড়াতে হবে শিক্ষার মান। জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের দিকে সবিশেষ নজর দিতে হবে।
যেকোনো দেশ বা জাতির সমৃদ্ধির জন্য তার জনগোষ্ঠীকে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত, সৃজনশীল, নৈতিকতাসম্পন্ন, আলোকিত মানুষ এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হয়। শিক্ষার মূল কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীকে প্রদীপ্ত করে তোলা, কুসংস্কারমুক্ত করা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিসম্পন্ন করা, অনুসন্ধানী মনের অধিকারী করা, সর্বোপরি সুনাগরিক হিসেবে সমাজে চলার উপযোগী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এখানেই মনে হয় আমরা ব্যর্থ। এর দায়ভার একার নয়। সবার। সকলের। সম্মিালিত চিন্তা চেতনার।
দেশের জনসংখ্যা সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগানোর মতো উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভিন্নধর্মী কাজ, কর্মকেন্দ্রিক দক্ষতা, সৃজনশীল জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ, গড়ে তুলতে হবে। তদুপরি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীকে বঞ্চিত রেখে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা নিশ্চিত করা যাবে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দুর্দান্ত দূরদর্শী প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই বিশাল বস্তুনিষ্ঠ এই ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০। দেশের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট বিশাল বড় সব অন্যান্য প্রকল্প কার্যক্রমের মোড়ক সমন্বিত করে লক্ষ্যানুগ হবে এই পরিকল্পনা; সমকালীন বাস্তবতার সাথে সম্ভব; এই দৃশ্য অবলোকন অপেক্ষায়!


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *