জুলাই ২৯, ২০২১ ৩:২৯ অপরাহ্ণ

তাহিরপুরের ৩ বালুমহাল ইজারা না দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের প্রতি এমপি ও চেয়ারম্যানের আহবান

শেয়ার করুন

আল-হেলাল,সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় জেলা প্রশাসনের নবসৃষ্ট ৩ বালুমহাল ইজারা প্রদান থেকে বিরত থাকার জন্য জেলা প্রশাসক এর প্রতি লিখিতভাবে আহবাণ জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ ১ নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য,উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিবর্গরা।
গত ১১/৭/২০১৯ইং তারিখে বালুমহাল ইজারা প্রদান বন্ধ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কে একটি ডিও লেটার দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জ ১ নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এতে তিনি উল্লেখ করেন,৭ জুলাই ২০১৯ইং জেলা প্রশাসক একটি ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। যাহা মাহারাম নদী অর্থাৎ যাদুকাটা নদীর অংশ বিশেষ জায়গা নিয়ে সৃষ্ট বালুমহাল। ইতিপূর্বে পাহাড়ি ঢলের পানি হইতে হাওর রক্ষার জন্য মাহারাম নদীর মোহনায় স্থায়ী বাঁধ দেয়া আছে। মাহারাম নদী থেকে বালু উত্তোলন করলে মাটিয়াইন হাওর,বলদার হাওর,সমসার হাওরসহ আরো ছোটখাটো হাওর পানিতে প্লাবিত হবে এবং বালু মিশ্রিত পানি এসে ফসলি জমির ক্ষতি হবে বলে এলাকাবাসী মনে করেন। এখানে বাস্তবতা যে,মাহারাম নদী হয়ে বোর্ডার রোডের সাথে যাদুকাটা নদীর উপর শাহ আরেফিন অদৈত মৈত্রী সেতুর সংযোগ সড়ক হবে। যাহা এলজিইডি কর্তৃক বর্তমানে নির্মাণাধীন আছে। উল্লেখিত মাহারাম ও যাদুকাটা বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশ ও নদীর মোহনার পরিবর্তন ঘটলে নির্মাণাধীন সেতুর প্রকল্প বাস্তবায়নে বিঘœ ঘটবে। এখানে আরো উল্লেখ্য যে,ইতিমধ্যে যাদুকাটা নদী,বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো থেকে ইজারা দেয়া হয়েছে। যাহার ফলে নতুন বালুমহাল ইজারা দিলে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ এলাকায় বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হবে। যাহা সরকার,প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের সুরক্ষা করা উচিত। সরকারের রাজস্ব আদায় থেকে মানুষের সুরক্ষা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা অধিক দায়িত্ব মনে করি। বিধায় জনস্বার্থে এ ধরনের সাংঘর্ষিক ইজারা প্রদান বন্ধ করা আবশ্যক।
একইভাবে গত ১৭/৭/২০১৯ইং তারিখে জেলা প্রশাসক বরাবরে,আরেকটি লিখিত আবেদন প্রদান করেন, তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুনাসিন্দু চৌধুরী বাবুল। “মাহারাম নদী ও যাদুকাটা নদীতে নবসৃষ্ট ৩টি বালু মহালের ইজারা কার্যক্রম বন্ধকরন প্রসঙ্গে” বিষয়ে উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন,মাহারাম নদীর ফসল রক্ষার স্থায়ী বাঁধ অংশে ও যাদুকাটা নদীর সম্মুখভাগে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জড়িত বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন ভারত বাংলাদেশের সীমানা অংশে এবং দেশের বৃহত্তম ফসল রক্ষাকারী মিছাখালি রাবার ডাম্প সংলগ্ন অংশে নবসৃষ্ট ৩টি বালুমহাল অবস্থিত। ইতিপূর্বে পাহাড়ী ঢলের পানি হইতে হাওরের ফসল রক্ষার জন্য মাহারাম নদীর মোহনায় ও যাদুকাটা নদীর ছালিয়ারঘাট মৌজার অংশে স্থায়ী ফসল রক্ষা বাধ দেওয়া আছে এবং ইকরআটিয়া মৌজার পার্শ্বে ফসল রক্ষার জন্য দেশের বৃহত্তম মিছাখালি রাবার ডাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। যাদুকাটা নদী পুরান লাউড় মৌজা অংশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জনিত কারণে নদী ভাঙ্গন হইতে বিজিবি ক্যাম্প রক্ষা,লাউড়েরগড় বাজার ও আশপাশের কয়েকটি গ্রাম এবং দেশের বৃহত্তম পর্যটকদের আকর্ষন দৃষ্টিনন্দন বারেকটিলা শিমুলবাগান নদীভা্গংন হতে রক্ষার জন্য স্থায়ীভাবে বাঁধ দেওয়া আছে। ৪০ বছর পূর্বে মাহারাম নদীতে পাহাড়ী ঢলে এলাকায় খালের সৃষ্টি হয়। যার ফলে এলাকার পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। যা এলাকার সকলেই অবগত। এমতাবস্থায় আলোচ্য নবসৃষ্ট ৩টি বালুমহাল ইজারা দিয়ে বালু উত্তোলন করা হলে দেশের বৃহত্তম মাটিয়াইন হাওর,শনির হাওর,বলদার হাওর,সমসার হাওর,করচার হাওর ও টাংগুয়ার হাওরসহ ছোটবড় প্রায় ২০টি ফসলি হাওর পাহাড়ী ঢলে প্লাবিত হয়ে লক্ষ লক্ষ কৃষকের কষ্ঠের ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, আলোচ্য মাহারাম ও যাদুকাটা নদীতে নবসৃষ্ট বালুমহাল অংশে বালু উত্তোলন করা হলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে যাদুকাটা নদীতে নির্মিত শাহ আরেফিন-অদ্বৈত মৈত্রী সেতু ও ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের বৃহত্তম মিছাখালি ফসল রক্ষা রাবার ডাম্প ক্ষতিগ্রস্থ হবে ও লাউড়েরগড় বিজিবি ক্যাম্প,লাউড়েরগড় বাজার,নদী তীরবর্তি অগনিত গ্রামসহ দেশের বৃহত্তম শিমুল বাগান ভেঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয় হয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা,জনজীবন মারাত্মকভাবে হুমকীর সম্মুখীন হবে। তাই নবসৃষ্ট ৩টি বালুমহালে ইজারা কার্যক্রম বন্ধকরনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান করুনাসিন্দু চৌধুরী বাবুল জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে অনুরোধ করেন। উক্ত আবেদনের কপি সদয় অবগতির জন্য ভূমি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীসহ দুই মন্ত্রণালয়ের সচিব এর কাছেও পাটানো হয়। তারপরও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বিরোধীয় নবসৃষ্ট ঐ ৩টি বালুমহাল ইজারা দেওয়ার জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহবাণ করে।
সাবেক ইজারাদার তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বালুমহাল ইজারা গ্রহনের জন্য সুনামগঞ্জে প্রায় ১৮টি লাইসেন্স আছে। এর মধ্যে একটি লাইসেন্স মাত্র নতুন। আরেকজন পুরাতন লাইসেন্সধারীর বিরুদ্ধে সুর্প্রীমকোর্টের ৫ জন বিজ্ঞ বিচারপতির একটি সুনির্দিষ্ট রায় রয়েছে। বিতর্কিত ঐ লাইসেন্সধারী কোন মহাল আর ইজারা গ্রহন করতে পারেননা। কিন্তু ৩টি বালুমহাল ইজারা গ্রহনের বেলায় কেবলমাত্র ঐ দুটি বিতর্কিত লাইসেন্সধারীকে কিভাবে এলাউ করা হয়েছে সে প্রশ্ন আমারও। আমার মনে হয় বিষয়গুলো বর্তমান জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নজরে কেউ আনেনি।
সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যের ডিও লেটার ও উপজেলা চেয়ারম্যানের আবেদনপত্র প্রদানের পরও কেন গত ৭ ফেব্রæয়ারি ২০২১ইং জেলা প্রশাসক কর্তৃক নবসৃষ্ট ৩টি বালুমহাল ইজারা প্রদানের নিমিত্তে দরপত্র আহবাণ করা হয়েছে এবং কথিত দরপত্রে মাত্র ২ ব্যক্তিকে আগ্রহী দরপত্র দাখিলকারী হিসেবে মনোনিত করা হয়েছে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন সুস্পষ্ট জবাবে বলেন,এমপি সাহেবের ডিও লেটার ও উপজেলা চেয়ারম্যান এর আবেদন প্রদানের বিষয়টি দু বছর আগে দাখিলকৃত ছিল। সে সময় আমি এখানে কর্মরত ছিলামনা। বালুমহাল ইজারা প্রদানের বিষয়টি এককভাবে জেলা প্রশাসকের সদিচ্ছা বা দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা। যা হয় সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই করতে হয়। জনপ্রতিনিধিরা যদি সরকারকে বুঝাতে পারেন নবসৃষ্ট বালুমহালগুলো ইজারা প্রদানের প্রয়োজন নেই বা কর্তৃপক্ষ যদি আমাদেরকে ইজারা প্রদানে বিধিনিষেধ আরোপ করেন তাহলে আমরা ইজারা দেবনা। ৭ ফেব্রæয়ারি ২০২১ইং দরপত্র আহবাণের ব্যাপারে তিনি বলেন,নিয়ম নীতি বিধি বিধান মেনেই এ দরপত্র আহবাণ করা হয়েছিল। আগ্রহী বা বঞ্চিত দরপত্রদাতাদের মধ্যে কেউ যদি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিডিউল সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে আমাদেরকে জানাতেন তাহলে আমরা তাদেরকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় হতে দরপত্র সংগ্রহের কথা বলে দিতাম। যা বিজ্ঞপ্তিতেও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক আরো বলেন,আমরা বিজ্ঞ আদালতের পূর্বের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে নিশ্চিত হয়ে দরপত্র আহবাণ করেছিলাম। এবং নিয়মানুযায়ী ইজারাদার মনোনিত করেছিলাম। কিন্তু পরে যখন জানলাম ইজারা কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ নিয়ে রোল জারী হয়েছে তখনই ইজারা কার্যক্রম আমরা স্থগিত রেখে দিয়েছি। আমরা কারো কাছ থেকে ইজারামূল্য গ্রহন করিনি। এবং কাউকে মহালগুলোর দখলও সমজিয়ে দেইনি। লিগ্যাল সাপোর্ট এন্ড পিপলস রাইট ফাউন্ডেশন (এল.এস.পি.আর.এফ) এর দায়েরকৃত ৭৯৬৪/২০১৯ নং রীট পিটিশন মামলার ৪/৪/২০২১ইং তারিখের স্থগিতাদেশ লঙণ করার কোন সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, নবসৃষ্ট ৩টি বালুমহাল ইজারা প্রদানের ব্যাপারে বিজ্ঞ আদালতের সকল আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্যর ডিও লেটার ও উপজেলা চেয়ারম্যানের আবেদনে বর্ণিত সকল বিষয় অবশ্যই আইনসঙ্গত ভাবে জেলা প্রশাসন আমলে নেবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

 


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *