মে ৯, ২০২১ ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

ধোপাজান নদীতে রাতের ড্রেজার তান্ডব বন্ধে যৌথবাহিনী সমন্বয়ে দুটি ক্যাম্প বসানোর দাবী

শেয়ার করুন

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
দিনে মোবাইল কোর্ট হলেও রাতের বেলা সুনামগঞ্জের ধোপাজান নদীতে বেপরোয়াভাবে চলছে ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালু পাথর উত্তোলনের প্রতিযোগীতা। শহরের একশ্রেণির ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট এলাকার সমস্ত বালি পাথর ব্যবসায়ীদের স্বার্থে রাতের বেলা ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালু পাথর উত্তোলন করে রাতের বেলা সীমান্ত সংলগ্ন চলতি নদী অতিক্রম করে ধোপাজান নদী হয়ে সুরমা নদীতে বের হয়ে উজানের দিকে চলে যাচ্ছে। আবার রাতের বেলায় খালি কার্গো,বলগেড ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা ধোপাজানে প্রবেশ করিয়ে ডলুরা সীমান্ত সংলগ্ন জিরো পয়েন্টের চলতি নদীর তলদেশ হতে ড্রেজার মেশিন দ্বারা বেপরোয়াভাবে বালি পাথর উত্তোলন করত: স্বস্ব নৌযানগুলো বুঝাই করে ভোরের বেলা নিরাপদে বের হয়ে যাচ্ছে। শনিবার রাত ৮টা থেকে শুরু হয়েছে প্রায় দেড়শত বলগেড ও ইঞ্জিন চালিত নৌকায় এমনিভাবেই বালু পাথর উত্তোলন।
স্থানীয়রা বলছেন,সুনামগঞ্জ শহরের সন্নিকটে রয়েছে সুরমা নদী। এই নদীর পাড়ে আছে নবীগঞ্জ বিজিবি ক্যাম্প, সুনামগঞ্জ শহর পুলিশ ফাঁড়ি, বিজিবি ২৮ ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর,র‌্যাব সুনামগঞ্জ সিপিসি-৩ ইউনিট এর মল্লিকপুরস্থ কার্যালয়,ওয়েজখালীতে আনসার ভিডিপি অফিস,সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানা ও টুকেরঘাট নৌ পুলিশ ফাড়ি। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর এতসব ইউনিট থাকার পরও বন্ধ হচ্ছেনা অবৈধভাবে বালি পাথর উত্তোলন ব্যবসা। রাতে নদীতে অভিযান পরিচালনা করা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হলেও রাতের বেলা সুরমা নদী দিয়ে বালু পাথর বহন করে চলাচলকারী বলগেড ও ইঞ্জিন নৌকার গতিরোধ বা আটক করে ঐসব বালিপাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে স্বস্ব অবস্থান থেকে উক্ত সরকারী ইউনিটগুলো এগিয়ে আসার সুযোগ থাকলেও কেউই কোন পদক্ষেপ গ্রহন করছেনা। সবাই বলছে এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জেলা কর্মকর্তাদের পূর্বানুুমতি থাকতে হবে। অনুমতি পেলে আর সীমান্ত সংলগ্ন ধোপাজানে নয় বরং ধোপাজানের মুখের মধ্যে ও স্বস্ব দপ্তরের সামনে থেকেই আমরা ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারি। এমন বক্তব্য আনসার ভিডিপি,পুলিশ প্রশাসন,বিজিবি,নৌপুলিশ সদস্যসহ সকল আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এছাড়া শুধু এককভাবে নয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর যৌথ নেতৃত্বে সকল বাহিনী সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী দিয়ে ধোপাজান নদীর প্রবেশমুখে স্থায়ী ক্যাম্প বসিয়ে ধোপাজান নদী শাসনের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে দাবী জানিয়েছেন সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমির হোসেন রেজা। তিনি বলেন,ধোপাজান নদীর মুখে ও জিনারপুরে পুলিশ,র‌্যাব বিজিবি,আনসার ভিডিপি,নৌপুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পৃথক দুটি ক্যাম্প বসালে রাতের বেলা অবৈধ বালি পাথর উত্তোলন বন্ধ হবে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের টুকেরঘাট নৌ পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ এসআই মোঃ রকিবুল ইসলাম বলেন,আমরা সীমিত লোকবল নিয়ে নদী শাসন করছি। আমরা অবৈধ বালি পাথর উত্তোলনকারী নৌকা আটক করছি। জড়িতদের গ্রেফতার করে মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করছি। রাতের বেলা নদীতে অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লোকবল ও স্পীডবোট আমাদের কাছে নেই। আমরা ভাড়া করা ছোট ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে মাঝেমধ্যে অভিযান চালাই। তারপরও আমাদের নৌপুলিশ ফাড়ির সিলেট জোনের জেলা পুলিশ সুপার যদি রাতের বেলা অভিযান পরিচালনার জন্য নির্দেশ দেন আমরা সেই নির্দেশ পালনে সচেষ্ট থাকবো।

সুনামগঞ্জ আনসার ভিডিপি জেলা কার্যালয়ের সহকারী জেলা কমান্ডেন্ট সাজ্জাদ হোসেন সেলিম বলেন,সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় আমাদের ভাতাভোগী অনেক আনসার ভিডিপি ছাড়াও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক আনসার সদস্য রয়েছেন। শুধু ধোপাজান নদী কেন জেলা প্রশাসক চাইলে যেকোন কাজে আমাদের পর্যাপ্ত পরিমান জনবল যেকোন সরকারী কাজে লাগাতে পারেন। জেলা প্রশাসকের হুকুম পাওয়া মাত্র আমরা নদী শাসনে দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত আছি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ইমরান শাহরীয়ার বলেন,ধোপাজান নদীতে একটা পুলিশ ক্যাম্প ছিল। সেই ক্যাম্প দ্বারা বালিপাথর উত্তোলন বন্ধ করা যায়নি। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত সবসময়ই রাতের বেলা শত শত নৌকা ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালি পাথর উত্তোলন করে নিরাপদে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রতিনিয়ত বালি পাথর বহনকারী নৌকা মালিক শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তাদেরকে আর্থিক জরিমানা করে যাচ্ছি। পুলিশ প্রশাসন উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সাথে বালু পাথর উত্তোলনকারী নৌকা আটক ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কাজে সহযোগীতা অব্যাহত রেখেছে। রাতের বেলা ধোপাজান নদীতে বালু পাথর উত্তোলন করতে জেলা প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে বলে আমি মনে করি।
সিলেট নৌপুলিশের পুলিশ সুপার মোছাম্মদ সম্পা ইয়াসমিন বলেন,সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থেকে ধর্মপাশার শানবাড়ী পর্যন্ত আমাদের ৫টি নৌ পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। ধোপাজান নদীর সন্নিকটে অবস্থানরত নৌপুলিশ ফাড়িটি হচ্ছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের টুকেরঘাট বাজারে। আমরা রটিন দায়িত্বের মধ্যে সুরমা নদীতে চাঁদাবাজী বন্ধে ও অবৈধ বালু পাথরসহ পরিবহনে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তাৎক্ষনিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌছে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নৌকা আটক করে মামলা দায়ের করি। কিন্তু জেলা প্রশাসন টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালনাকালে আমাদের কোন সহযোগীতা চাননা বলে আমরা ঐসব অভিযানে যেতে পারিনা। ধোপাজান নদীতে অবৈধ বালি পাথর উত্তোলন বন্ধে নৌপুলিশের সহযোগীতা গ্রহনের জন্য আমি জেলা প্রশাসক কে অনুরোধ জানাচ্ছি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাদিউর রহিম জাদিদ বলেন, ধোপাজান নদীতে আমরা দিনের বেলা অভিযান পরিচালনা করে বালু পাথর উত্তোলন বন্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছি। তারপরও বালু পাথর ব্যাবসায়ীরা রাতের বেলা ধোপাজান নদীতে বালু পাথর উত্তোলন করেই যাচ্ছে। তারা কোন নিষেধবাধা শুনছেনা। রাতের বেলা অভিযান পরিচালনা করা আমাদের পক্ষে অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে এরকম অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে আমাদের একজন কর্মকর্তা এসল্ট হয়েছিলেন। আমি রাতের বেলা বালু পাথর উত্তোলন বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে ইতিমধ্যে জিনারপুরে একটা পুলিশ ক্যাম্প বসানোর জন্য আবেদন করেছি। যদি জিনারপুরে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয় তাহলে রাতের বেলা বালিপাথর উত্তোলন বন্ধে কিছুটা হলেও সহযোগীতা হবে। তিনি আরো বলেন,ধোপাজান নদীতে যৌথ বাহিনী দিয়ে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প বসালে আরো ভাল হবে। কারণ ধোপাজান নদীর মুখে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প রেখে নিয়মিত টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হলে এবং নিয়মিত মনিটরিং করা হলে কোন কার্গো,বলগেড ও ইঞ্জিন নৌকা প্রবেশ করতে যেমন পারবেনা তেমনি বালি পাথর উত্তোলন করে কোন নৌপরিবহন বের হতে পারবেনা।
র‌্যাব ৯ সুনামগঞ্জ সিপিসি-৩ এর উপ-পরিচালক ও কোম্পানী অধিনায়ক লেঃ কমান্ডার সিঞ্চন আহমেদ বলেন,র‌্যাবের কাজ হচ্ছে মাদক,সন্ত্রাস,চাদাবাজী ও জঙ্গীবাদ নির্মূল করা। আমরা সীমিত লোকবলের মাধ্যমেই সেই রুটিন কাজগুলো নিয়মিত করে যাচ্ছি। সুনামগঞ্জে নদীপথে চাঁদাবাজী ও অবৈধ বালুপাথর উত্তোলন একটা বড় ও স্থানীয় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু র‌্যাবের কোন রিভার ইউনিট নেই। তাই সদিচ্ছা থাকলেও আমরা নদীতে অবৈধ বালু পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে পারিনা। তবে জেলা প্রশাসক যদি ধোপাজানসহ যেকোন নদী শাসনে আমাদের সহযোগীতা চান তবে দিনে অথবা রাতে যেকোন সময়ে আমরা জেলা প্রশাসনকে তাদের পরিচালিত অভিযানে সহযোগীতা করতে প্রস্তুত আছি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ ২৮ ব্যাটালিয়নের বিজিবি অধিনায়ক লে: কর্ণেল তসলিম এহসান সাংবাদিকদের বলেন,আমরা টাস্কফোর্সের অভিযানের মাধ্যমে নদীতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষাসহ বালু পাথর উত্তোলনে সচেষ্ট আছি। রাতের বেলা যদি জেলা প্রশাসন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করেন তাহলে ধোপাজান নদীতে রাতের বেলা অভিযান পরিচালনা করতে আমরা প্রস্তুত আছি।
জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান বিপিএম বলেন,কারো দাবীতে নয় আমি নিজ উদ্যোগে ধোপাজান নদীর প্রবেশমুখে একটা অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি পুলিশ চাইলেই নদীতে চাঁদাবাজী বন্ধ করতে পারে। আমরা সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করেছি। সুরমা ও ধোপাজান নদীতে সেভেন পার্টির চাঁদাবাজী এখন নেই বললেই চলে। রাতের বেলা ধোপাজান নদীতে বালি পাথরবাহী অনেক নৌযান আটক করে আমরা জেলা প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছি। তারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাতের বেলা জেলা প্রশাসন যদি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করেন তাহলে আমরা পুলিশ প্রশাসনতো একপায়ে খাড়া। সহযোগীতা করতে আমরা সবসময় প্রস্তুত। তবে প্রশাসনের পাশাপাশি এলাকার সচেতন নাগরিকবৃন্দকেও ধোপাজান নদী রক্ষায় এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
এ পর্যন্ত গত এক সপ্তাহের অভিযানে প্রায় ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় এবং মামলা দায়ের এর কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন,অসাধু ব্যবসায়ীরা ড্রেজার মেশিন দ্বারা রাতে বালি পাথর উত্তোলন করছে এটা অস্বীকার করছিনা। তবে আমরাও বসে নেই। আমাদের দুই উপজেলার কর্মকর্তারা নিয়মিত নদীতে অভিযান পরিচালনা করছেন। তিনি বলেন,রাতের বেলা নদীতে অভিযান পরিচালনা করা সরকারী কর্মকর্তাদের জন্য অনেকটা ঝুঁকির বিষয়। তারপরও কি করা যায় সেই ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছি। অবৈধ বালি পাথর উত্তোলনকারী যেই হউক কাউকে কোন ছাড় দেয়া হবেনা। আমাদের অভিযান চলছে এবং চলবে।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *