জুলাই ২৮, ২০২১ ৪:২৭ পূর্বাহ্ণ

প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাধারণ ব্যবসসায়ীরা : চাক্তাই শিল্প ও ব্যবসায়ী সমিতির আসলে কাজ কী?

শেয়ার করুন

চাক্তাই-এ সমিতির নামে নিয়মিত চাঁদাবাজি : পলিথিন ব্যাগ , হুণ্ডি ও ডলার ব্যবসা, অবৈধ ও চোরাই পণ্যের ট্রাক মুল টার্গেট

চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র চাক্তাই  শিল্প ও ব্যবসায়ী সমিতির নামে চাঁদাবাজি করার অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ পলিথিন ব্যাগ , হুণ্ডি, ডলার ব্যবসা ও চোরাই পণ্যে পরিবহণকৃত ও মালবাহী  ট্রাক থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলে অপরাধকে আশ্রয় দেবার মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে ওই সমিতির সভাপতি ও কেরানীর বিরুদ্ধে।  ফলে ধরাকে সরা জ্ঞান মনে করে বেপরোয়া জীবন যাপন করে সাধারণ জনগণকে নানা হয়রানি করে আসছে তারা । সাধারণ ব্যবসায়ীদের ‘গলার কাঁটা’  হিসেবে চাক্তাই বণিক সমিতি পরিণত হচ্ছে দিনকে দিন। ওই সমিতির সভাপতি হলেন হারুন রশিদ আর কেরানী হলেন ইউনুছ।

  জানা গেছে, সমিতির ৮ হাজার টাকা বেতনের কেরানি মোহাম্মদ ইউনুছ এক সময় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। চাক্তাই ব্যবসায়ী সমিতিতে চাকুরী নিয়ে দায়িত্ব নেয় সমিতির চাঁদা তোলার। সদস্যদের টাকা সমিতির ফান্ডে জমা না দিয়ে তিনি ভূয়া খরচ দেখিয়ে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে বনে যান কোটিপতি। শুরু হয় বিলাস বহুল জীবন যাপন গড়ে তোলেন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। সমিতির কেরাণী ইউনুছ বাকলিয়া থানা ও কোতোয়ালী থানা পুলিশ ও প্রশাসনের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদা তুলে নিজেই আত্মসাত করে আসছে প্রায় তিন যুগ ধরে। ইউনুছের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে কৌশলে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেল জুলুম ও নির্যাতন করার অভিযোগও রয়েছে।

‘৯২- ৯৩ সালে চাক্তাই ব্যবসায়ী সমিতির যাত্রা শুরু হওয়ার পর কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন ভেঙ্গে ২০০৫ সালে চাক্তাই শিল্প ও ব্যবসায়ী সমিতি নামে নামকরণ করা হয়। ২০১০-১১ সালে হায়দার চৌধুরীর কাছ থেকে জোরপূর্বক ক্ষমতা কেড়ে নেয় বর্তমান সভাপতি হারুন রশিদ। তখন থেকেই অবৈধভাবে সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন ফরিদ উদ্দীন আহমেদ। সমিতির নামে নিয়মিত চাঁদা তোলেন সমিতির কেরানি মো. ইউনুছ। কেরানি ইউনুছ ও সভাপতি হারুন রশীদকে নিয়ে পুরো সমিতি এখন নিয়ন্ত্রনে নেয় তারা। সমিতির কোন সদস্য কেরানির বিরুদ্ধে কিছু বলার চেষ্টা করলে কৌশলে ওই সদস্যকে সমিতি থেকে বের হয়ে যাওয়ার মত পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয় ইউনুছ। সমিতির সদস্যদের মাসিক চাঁদা ও ট্রাক প্রতি দৈনিক চাঁদার টাকা প্রশাসন ও পুলিশসহ বিভিন্ন কর্তা ব্যক্তিদের নামে খরচ দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ইউনুছ।

হারুন সভাপতি হওয়ার পর তার ছেলেদের দিয়ে চাক্তাই সিন্ডিকেট করে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ, ছালাসহ চোরাই ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। সভাপতি হারুন রশীদ ও তার পরিবার গত ১০ বছরে বিপুল টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। যা তদন্ত করলে সত্যটা বেরিয়ে আসবে বলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা দাবী করেন। দুদক চাইলে সভাপতি ও কেরানীর বিপুল টাকার উৎস বের করতে পারবে সাধারণ ব্যবসায়ীরা মনে করেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্ধারিত হারে চাঁদা নেওয়া হলেও সমিতির নেতারা তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ করেন না। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছেন। সালিশের নামে অবৈধ ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ায় অনেক আসল ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছেন। মোটা অংকের টাকা পেলে সমিতির নেতাদের রায় চলে যায় অবৈধ ব্যবসায়ীর পক্ষে। তারা সালিশের নামে দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানিয়ে ফেলেন।

পণ্যবাহী ট্রাক থেকে কোটি টাকার চাঁদাবাজি, সালিশের নামে পাওনা টাকা আত্মসাৎ, ব্যবসায়ীদের চাঁদার টাকায় নেতাদের অবৈধ ব্যবসা এবং জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলসহ নানা কারণে চাক্তাই এলাকার ব্যবসায়ীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে চাক্তাই শিল্প ও বণিক সমিতি। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ও চাক্তাইয়ের সুনাম রক্ষায় অবৈধভাবে সমিতির দখল নেওয়া নেতাদের লাগাম ধরার কেউ নেই। এদের নৈরাজ্যের কারণে বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের বাজারে প্রায় সময় অস্থিরতা বিরাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে চাক্তাইয়ের সুনাম ফিরিয়ে আনার দাবি ব্যবসায়ীদের।তারা আরও জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক থেকে সিকিউরিটি গার্ডদের মাধ্যমে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে। এসব কিছুর মূলে রয়েছে অবৈধ সমিতির কেরানি  মো. ইউনুছ। তার পিছনে শক্তি হিসেবে কাজ করছেন বণিক সমিতির সভাপতি হারুন রশিদ। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে নির্বাচনের মাধ্যমে সমিতির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তারা।

অন্যদিকে, সমিতির কার্যনিবাহী সদস্য হাসান মুরাদ বলেন, কেউ নির্বাচনে প্রার্থী না থাকায় মিলে মিশে এই কমিটি গঠিত হয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা জানেন  না কখন ভোট হলো ? কখন কে প্রার্থী হলো এসব বিষয়।

সমিতির কার্যনির্বাহী পদে থাকা এক নেতা বলেন, এই সমিতির ধ্বংসের মূলে যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে হারুন রশিদ অন্যতম। তার সমস্ত অপকর্মের মূল হোতা হলেন কেরানি মো. ইউনুছ। তিনি অবৈধ ব্যবসায়ীদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে চাক্তাই এলাকার সুনাম নষ্ট করছেন।

 তেল চুরি ও নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবসার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত আছেন ইউনুছ । হারুনের ছেলে মুরশেদ রশীদ পলিথিন ব্যাগ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন।

  সমিতির কেরানি ইউনুছ সমিতির বিপুল টাকা আত্মসাত করে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার পাশাপাশি পটিয়ার গ্রামের বাড়ী আশিয়া মল্লাপাড়ায় বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করে। যে বাড়ী নিমার্ণে কোটি টাকা খরচ করা হয়। যদিও তিনি  চাক্তাই এলাকায়  বাসায় থাকেন।  চাক্তাইয়ের বাসায়  বিদেশী কুকুর পালন, কুকুরকে দেখাশুনা করতে ৫ হাজার টাকা বেতনে কাজের মানুষও রেখেছেন এই ইউনুছ।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, চাক্তাই এলাকায় দৈনিক ৬শ’র বেশি ট্রাক প্রবেশ করে। রাজাখালী দিয়ে গাড়ি চাক্তাই প্রবেশ করলে প্রতি ট্রাকে ১৫০ টাকা চাঁদা নেয়া হয়। মাঝখানে টোকেন স্লিপ চেক করার নামে আবার নেওয়া হয় ৫০ টাকা। গন্তব্য ছেড়ে যেতে পণ্যবাহী ট্রাক চামড়ার গুদাম হয়ে বের হওয়ার সময় আবারও নেওয়া ৫০ টাকা। সেই হিসেবে দৈনিক একটি পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা নেওয়া হয় ২৫০ টাকা। এভাবে দৈনিক ৬শ ট্রাক থেকে চাঁদা নেওয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যা মাসে দাঁড়ায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। আবার পলিথিন, ভেজাল মশলা, ভেজাল ঘি, ভেজাল দুধ পাউডার ও অন্যান্য অবৈধ পণ্য বহনে নেয়া হয় চুক্তিভিত্তিক মোটা অংক। এসব অবৈধ পণ্যবাহী ট্রাকে মদ, গাজা ও ইয়াবাও পাচার হয় ইউনুছের জ্ঞাত অনুসারে। যা সমিতির অপরাপর অনেকেই জানেন  না।
এ ছাড়া চাক্তাই এলাকায় প্রায় ৩১শ’ ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই সমিতির সদস্য নন। সমিতির উন্নয়নের কথা বলে এসব দোকান থেকেও ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়।

সমিতির অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে একাধিক মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ করেন ট্রাক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা নিজাম উদ্দীন কাজল। এবিষয়ে চাক্তাই ব্যবসায়ী সমিতির নেতা ও ট্রাক সমিতির উপদেষ্টা নিজাম উদ্দীন কাজল বলেন, সমিতির আয় ব্যয় হিসাব এবং সমিতির নামে গণহারে চাঁদাবাজির ঘটনায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে তারা আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে বলে জানান। নিজাম উদ্দীন কাজল আরো জানান, বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা প্রতিটি ট্রাক মাঝি থেকে (পার্টি ) যেমন বাঁশখালী, আনোয়ারা, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াসহ ট্রাক প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে আদায় করে থাকে। এই রকম শতাধিক ট্রাক রয়েছে। শহর থেকে ট্রাক ছাড়ার সময় গার্ড জাফরকে দিতে হয় ৫০ টাকা। টাকা দিতে গড়িমসি করলে তেরপাল ও রশি নিয়ে যায় এবং ইচ্ছামতো জরিমানা করে থাকে।ট্রাক ড্রাইভারেরা এসব গার্ডদের কাছে এখানে চরম অসহায়।

   এ বিষয়ে চাক্তাই ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হারুন রশীদের সাথে কথা বলতে চাইলে তার ছেলে পরিচয়ে একজন ফোন রিসিভ করে । সভাপতি বিশ্রাম নিচ্ছেন পরে ফোন করবেন বলেন বলে ফোন রেখে দেন। পুনরায় একই নাম্বার থেকে ফোনে তথ্য জানার জন্য ফোন করলেও আর ফোন রিসিভ হয়নি। মুঠোফোনে মেসেজ দিলে সাড়া মেলেনি ফলে সভাপতির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

  এ বিষয়ে কেরানী ইউনুছ আমাদের প্রতিনিধিকে বলেন, ট্রাক থেকে চাঁদা নেবার কথা সঠিক নয়। সমিতির কেউই চাঁদা নেন না।। এই বিষয়ে পুলিশ ফাঁড়ীর পুলিশ সদস্যরাই ভালো জানে । নির্বাচনের মাধ্যমে এই সমিতির কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়।  বিদেশী কুকুর আমি নই, আমার  ছেলে ( উকিল )পালন করে। আমার ছেলেও আমার সাথে একই বাসায় থাকে। আমার গ্রামের বাড়ীতে যে বিল্ডিং নির্মাণ করেছি তা ব্যবসার টাকা ও পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে করেছি।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *